Bangladeshi Coins

ইএমআই / ইন্সটলমেন্ট / কিস্তি-এর সমস্যা: ০% হোক বা না হোক

সাধ্যের বাইরের জিনিস কেনার একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হল ইন্সটলমেন্ট বা কিস্তি। অনেক শোরুমেই আজকাল ইন্সটলমেন্ট-এ বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করা যায়। কিন্তু, ব্যাপারটা একবার খেয়াল করে দেখুন, “সাধ্যের বাইরে থাকা একটি জিনিস ক্রয় করা।” অর্থাৎ, যা আপনার ক্রয় করার কথা না, যা আদতেই আপনার বাজেটের সাথে যায় না, তা আপনি ক্রয় করতে পারছেন।

মন্দ কি?

সমস্যা কই? এতে তো সুবিধেই হয়, আস্তে আস্তে পাওনা টাকা পরিশোধ করে ফেলা যায়। আর 0% হলে তো অংক কষে দেখিয়ে দেবেন মশাই, কোন ক্ষতিই নেই।

মানসিকতা

সমস্যা হল আমাদের মানসিকতা। একটা জিনিস খেয়াল করেছেন কি, বড় বড় দোকানে সব পণ্যের দাম ৯৯৯৯ টাকা কিংবা ১২৯৯৯৯ টাকা? এক টাকা কমিয়ে লেখা হয় কেন? যদিও আপনি সচেতনভাবেই জানেন ৯৯৯৯ টাকা হল ১০০০০ টাকার থেকে মাত্র ১ টাকা কম, কিন্তু অবচেতনভাবে আপনি শুরুর ৯ টাকেই দেখছেন। অবচেতন মনে ভাবছেন, বাহ! ৯০০০ টাকা, মন্দ কি!

ভিন্ন উদাহরণ টানার জন্য দুঃখিত। এবার আসল কথায় আসি। যখন আপনি ১,৩০,০০০ টাকার একটি ফ্রিজ কিনতে যাচ্ছেন, এককালীন পরিশোধ করতে গেলে 99% বাঙালি সরে আসবেন। পাগল! পানি আর খাবার ঠান্ডা রাখতে দেড় লাখ টাকা কে খরচ করবে! কিন্তু যখন আপনাকে কিস্তিতে ভেঙ্গে দেখাবে, “স্যার, মাসে মাত্র ৫৪০০ টাকা কিস্তি দিতে হবে” – তখন অবচেতন মনে কিন্তু ৫৪০০ ই ঘুরবে। ১,৩০,০০০ এর কথা আর মাথায় থাকবে না।

দুই বছর পরে কিস্তি শোধ হয়ে যাবার পর, আপনার মনে হবে, কিই বা আর! মাসে মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার টাকাই দিলাম। এমন কি! কিন্তু আপনি তো দিয়ে দিয়েছেন ১,৩০,০০০ টাকা। ওই টাকাটা আপনার মিউচুয়াল ফান্ডে বা কোন ইনভেস্টমেন্ট অ্যাকাউন্টে থাকতে পারত; অথবা অত কিছু ধরলাম না, সেভিংসেই থাকত না হয়!

মূল্যস্ফীতি

এখন একটা প্রশ্ন মাথায় আসতে পারে, মূল্যস্ফীতি হলে তো আমার জমানো ১,৩০,০০০ হাজার টাকার মান কমে যায়! সেক্ষেত্রে আপনার মাথার জন্য পাল্টা প্রশ্ন, আপনার ফ্রিজ যে দামে কিনেছেন, তার চেয়ে বেশি দামে বেচঁতে পারবেন? বা যে দামে কিনেছেন সে দামে? তার কাছাকাছি দামে?

৩০,০০০ টাকার ফ্রিজ আপনাকে যে সার্ভিস দিত, এইটা কি আহামরি বেশি সার্ভিস দিয়েছে?

সামর্থ্য

সামর্থ্যের সংজ্ঞা হয়ত আমরা ভুলে গেছি। সামর্থ্য বলতে আমরা এখন বুঝি, মাসিক কিস্তি পরিশোধ করতে পারব কিনা! না! সামর্থ্য অর্থ বাকি না রেখে, আমি অমুক জিনিস কিনতে পারব কিনা। কিস্তিতে কেনা হল বাকি রেখে কেনা। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ইএমআই করাও বাকি দিয়ে কেনা। বাকি দিয়ে কেনা পণ্য নিশ্চয়ই সামর্থ্যের ভেতরের পণ্য নয়!

কিস্তির ফাঁদ হল একটি মানসিক ফাঁদ। আপনি নিজেই নিজেকে ফাঁদে ফেলে দিয়ে থাকেন। কোন পণ্যের দামকে হঠাৎ করেই ১২ ভাগের এক ১ ভাগ মনে করে ফেলেন! এটি আপনার দোষ নয়। এটি মানুষ হিসেবে আমাদের থাকা কিছু ত্রুটির একটি; এজন্য লজ্জিত বা রাগাণ্বিত হবার কিছুই নেই।

শেষ কথা

শোরুমের প্রয়োজন পণ্য বিক্রি করা, ব্যাংকের প্রয়োজন আপনাকে খরচ করানো, আপনার প্রয়োজন অনিয়ন্ত্রিত খরচ পরিহার করা; সচেতনভাবে আপনার অর্থ-সম্পদ ব্যবহার করা। সবাইকেই সবার কাজ করতে হবে। ইএমআই বেআইনি করে ফেলা হোক, বা যারা ইএমআই করে তারা বোকা – এ কথা বলছি না। তবে ইন্সটলমেন্ট / বাকি / কিস্তি – এসব ব্যাপারে মোট দাম / টোটাল কস্ট হিসেব করাটা জরুরি – মাসিক কিস্তি নয়! কারণ, আপনার মন নানাভাবে আপনার সাথে কারসাজি করতে পারে! সাবধান।

7 thoughts on “ইএমআই / ইন্সটলমেন্ট / কিস্তি-এর সমস্যা: ০% হোক বা না হোক”

  1. এ ব্যাপারে ছোট্ট একটি মন্তব্য যুক্ত করি। EMI কে আমি ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে খারাপ ভাবেও দেখি আমার এটার কিছু ভালো দিক ও আছে। প্রবন্ধটি এর মূল উদ্দেশ্য বুঝেছি, কিন্তু শেষে এসে EMI কে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারটিতেই আমার দ্বিমত। যেমন ধরুন সামনে কেউ বিবাহ করতে ইচ্ছুক এখন সে তার নতুন সংসার এর জন্য কিছু আসবাবপত্র কিনতে চায়। সবারই জানার কথা বিয়েতে খরচ টা কেমন হয়। এখন সে যদি বিয়ের শুরুতেই দের লক্ষ টাকা আসবাবপত্রতেই ঢেলে ফেলে সেটা তার জন্য বিবাহের খরচ এ বড় চাপ হয়ে যাবে। কিন্তু সে যদি এটা কিস্তিতে নেয় তবে কিন্তু ঘরে আসবাবপত্র গুলো বিবাহের আগেও এসে গেলো বিবাহের জন্য তার উপর অতিরিক্ত খরচ ও এলো না।
    আমি আমার জীবন থেকেই বলি দেশের বাইরে ঘুরতে যাবার আগে একটি ভালো DSLR ক্যামেরা কিনতে চাচ্ছিলাম। এখন আমি যদি কিস্তিতে না নিয়ে সেটা একবারে কিনলে বাইরে ঘুরতে যাবার জন্য বাজেট ও কমে আসতো।
    আশা করি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি।

    1. এখানে কিন্তু পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার প্রশ্নই আসেনি। শেষ প্যারাটি পড়ে দেখার অনুরোধ করছি। পোস্টটির মূল উদ্দেশ্য, ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মাসিক কিস্তির চিন্তা করে পুরো কস্টের হিসেবটাও করে ফেলা উচিৎ। কারণ ওই পরিমাণ টাকা আপনি হারাচ্ছেন প্রকৃতপক্ষে।

    1. আপনার মতামতকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই। আপনি যদি আপনার যুক্তিগুলো উপস্থাপন করার সুযোগ পান, তাহলে পাঠকদের অনেকেই উপকৃত হবেন!

  2. আমাদের অনেকেই যখন ১৫ হাজার টাকা বেতন পেতাম, তখনকার অবস্থা আর আজ দেড় লক্ষ টাকা বেতন পেয়েও অবস্থা একই। কারন খরচটা বেড়ে গেছে। বেড়েছে পন্য আসক্তি ও পন্য দাসত্ব।

    আর বোকা এক শ্রেনীর মানুষ খুব সহজেই এতে পা দিচ্ছেন। যে টাকা আপনার না, ক্রেডিট কার্ডের নামে আপনি সেই টাকা খরচ করছেন।

    বিয়ে করবেন? কিস্তিতে মিলছে সব ফারনিচার, হানিমুনে যাবেন? বাকিতে বালি যান। টিকিট বাকিতে কেনেন। একটা ক্যামেরা নিবেন না? কিনেন বাকিতে? কিস্তি তো আছে। অল্প অল্প করে দেবেন।

    আমরা প্রথমে সেই ফাদে পা দেই। ধরেন, আপনি ৮০০০০ টাকা বেতন পান৷ ফুটানী মেরে বিয়ে করতে গিয়ে ধার করেছেন তিন লাখ। এবার বালি যাচ্ছেন বাকিতে। মাসে কিস্তি ৭০০০ টাকা মাত্র। বাসায় পাতলা টিভি এনেছেন। ওখানে কিস্তি আর ৫০০০টাকা৷ বাসা ভাড়া দেন ৩০ হাজার। মাসে দুই চারবার বোগো খেয়ে পোস্ট দিয়ে ফুটানী মারেন। কিন্তু টাকা আর শোধ হয় না। কিভাবে টাকা শোধ দিবেন এই নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তা। মন ভালো থাকে না। মেন্টাল শান্তি নাই। সামনে গরম কাল, এসি লাগাতে হবে ঘরে। আপনার মাথায় ঢুকে গেছে এসিই আপনার চোখে ঘুম এনে দিবে।

    স্যার, বাকিতে এসি নেন। পরে আস্তে আস্তে শোধ করে দেবেন। বাকি বোঝা আরেকটু বাড়লো। এর মাঝে আপনার বউ প্রেগন্যান্ট। তাকে ডাক্তার দেখাতে হবে। বেতনের টাকা ভাড়া আর কিস্তি দিতে দিতে শেষ। এবার নতুন পরিশরে, কিস্তি আর কার্ড দিয়ে আর কুলাচ্ছে না, এবার ধার করতে হবে।

    নিজের ইমেজের ১২টা বাজিয়ে নিলেন ধার। বললেন ২০ দিন পর শোধ দেবেন। কিন্তু ২০ দিনে আপনার আয় বাড়বে কি? নাকি আবার ধার করবেন। ২০ দিন পেরিয়ে ২২ দিন হতে গেল। এবার বন্ধু আপনাকে ফোন দিলো। আপনি ভাবলেন কি মিথ্যা অজুহাত দেয়া যায়। আচ্ছা দিলেন একটা কিছু। আপনার মিথ্যা বলার হাতে খড়ি। আপনি টয়লেটে গেলে বলেন মতিঝিল, আর মতিঝিল গেলে বলেন পীরের বাগ। ঠিক পলাতক আসামীর মতো।

    এদিকে আবার এনিভারসারি, ফুটানী মেরে একটা কিছু তো কিনতেই হবে। আগের বন্ধু আর না, এবার চাবো কলিগের কাছে। ওমা, ওয়াইফের ডেলিভারী ডেট আসন্ন। পাচ তারকা মানের হাস পাতালে যেতে হবে। এবার আত্মীয়ের থেকে টাকা ধার করি।

    নাহ, এতো টেনশন আর নিতে পারছি না। এবার আপনার বাবার অবসরে যাওয়ার পর যে কয়টা টাকা পেয়েছে তার দিকে নজর। তাই নিয়ে তুমুল ঝগড়া। বাবা শেষ মেশ কিছু টাকা দিলেন।

    কিন্তু হায়, আজ আবার পল্টুটার জংমদিন।

    আবার ফুটানী মারার চেস্টা, যা নেই তা নিয়ে বড়াই করা ও শো অফের চেস্টা। যে টাকা আপনার না, যে টাকা আপনি কামাই করেন নাই, তাই খরচ করা আবার নতুন করে শুরু।

    কি যে ভয়ানক এই সাইকেল, তা কেবল মাত্র এই সাইকেলে যারা পড়েছেন, তারাই জানেন। এতো টাকা আয় করেন, টাকা যায় কই? মনে তো কোন শান্তি নেই, টেনশন।

    আমেরিকার মানুষ এখন তিন ট্রিলিয়ন ডলার লোনে ডুবে আছে। বাংলাদেশে যারা শহরে থাকেন, ও সারা বছরের আয় প্রায় ১০ লক্ষ টাকা, তাদের প্রত্যেকের প্রায় ৩-৪ লক্ষ টাকার লোন রয়েছে। এই টাকা কিভাবে শোধ দিবেন, সেই চিন্তা প্রতিনিয়ত আমাদের অসুস্থ করে তুলছে।

    অনেক বাবা মা সন্তানের জন্যে কিছু করার তালে ফ্ল্যাট কেনাকে জীবনের লক্ষ্য করে ফেলেন। বাবা মা হিসেবে সন্তানকে ভালো মানুষ করার লক্ষ্য দিতে হবে। আপনি নিজেই যদি তাকে ফ্লাট করে দেন, তাহলে সে আর করবেটা কি? আয় বুঝে খরচ করুন। অপচয় ও ফুটানী ধর্মীয় দিক বিবেচনায়ও নিষিদ্ধ। আপনি কি মনে করেন, আপনার এই জীবন যাপন আজ থেকে ২০০ বছর পর আপনার পরের জেনারেশন মনে রাখবে? তারা কি আপনার মতো নিঃস্ব, কিস্তি জর্জরিত, ঋণগ্রস্থ মানুষকে মনে রাখবে?

    বড়শি দিয়ে মাছ যেমন ধরা হয়, নেড়ে চেড়ে আধার খেতে দেয়, গলায় বিধে নিলে আর নিস্তার নাই। খাচার পাখি ভালো খেতে পায়, কিন্তু জীবনটা থাকে বন্দী। তেমনি ঋণ যে করে তারও নিজের উপর আর নিজের কন্ট্রোল থাকে না।

    ভালো হয় নিত্য দিন দানের অভ্যাস করুন। যে দান করে তার হাত উপরে থাকে আর যে ঋন করে বা হাত পাতে তার হাত থাকে নিচে।

    Collected post: copied from Masud Rahaman’s post (which could not be shared directly due to restricted privacy setting)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.